ছাত্র কল্যাণের জন্ম-কথা


অনল প্রকাশনা ও প্রতিভার অন্বেষণ সূচনা-গাঁথা
ডা. নেভেল ডিঃ রোজারিও


বাংলার খ্রীষ্টম-লীর গঠন ও প্রসারের ক্রমবিকাশের ধারা অনুসরণ করলে দেখা যায় যে প্রায় চার’শ বছরের পুরোনো হলেও ষাট দশক পর্যন্ত এদেশীয় খ্রীষ্টম-লী তাদের জীবনযাত্রা ও আচরণে বিদেশীপনার বহিঃপ্রকাশের কারণে এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে সবসময়ই চিহ্নিত ছিল নিজদেশে পরবাসী রূপে। ষাটের দশকের শেষের দিকে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার প্রতিফলনও পড়ে ঢাকার তৎকালীন ক্ষুদ্র খ্রীষ্টান যুব ও ছাত্র সমাজে। বাইরের সিঞ্চিত জলে লালিত টবে লাগানো মেকী বাহারী পাতাবাহারের রূপ থেকে খ্রীষ্টান সমাজকে বের করে এদেশের মাটিতে প্রোথিত করে এদেশেরই বৃহত্তর জনগণের সাথে সম্পৃক্ত করার সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে আসে তখনকার খ্রীষ্টান যুব ও ছাত্র সমাজ। সুহৃদ সংঘ, ত্রিবেণী ছাত্রকল্যাণ সংঘসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠতে থাকে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ খ্রীষ্টান যুব সংগঠন সমূহ।


ষাটের দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রীষ্টান ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। হোস্টেল থাকার কারণে হলিক্রশ কলেজ ও নটরডেম কলেজেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত খ্রীষ্টান ছাত্র-ছাত্রীদের ছিল সংখ্যাধিক্য। নার্সিং পেশাকে খ্রীষ্টান ছাত্রীরা মহান ও মানব সেবার অংশ মনে করতো। হলি ফ্যামিলী নার্সিং স্কুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকীরা ছিল জগন্ন্াথ কলেজ, কায়দে আযম কলেজ, সলিমুল্লাহ কলেজে অধ্যয়নরত।
এমনি এক পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার বিভিন্ন কলেজ ও সমকক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত খ্রীষ্টান ছাত্র-ছাত্রীরা অনুভব করে যে, নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে সমাজক্যাণ, সমাজসেবা ও সমাজ-সংস্কারমূলক কাজে এগিয়ে আসার জন্যে একটা খ্রীষ্টান ছাত্র সংগঠন থাকা আবশ্যক। যেখানে খ্রীষ্টিয় আদর্শ ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতিফলনের পাশাপাশি গড়ে তোলা যাবে পারস্পরিক পরিচিতি ও সহানুভূতিশীল সম্পকের উন্নয়ণ এবং জাতীয় চেতনাবোধ। সামাজিক অন্যায়-অবিচার বোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের দাবীতে খ্রীষ্টান ছাত্র সমাজ হতে পারবে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদী।


এ ধ্যান-ধারণাকে সামনে রেখে পরপর কয়েকটি খন্ড সভার পর ১৯৭০ সালের ১৩ই ফেব্রুুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র মি. চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ নটর ডেম কলেজে ঢাকার ছাত্র-ছাত্রদের এক সভা আহ্বান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর ছাত্র মি. হিউবার্ট অরুণ রোজারিও’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় সংগঠনের শাসনতন্ত্র প্রনয়ণ ও তা দু’মাসের মধ্যে পরবর্তী সধারণ সভায় পেশ করার দায়িত্ব নিয়ে নি¤œলিখিতদের নিয়ে ৯ সদস্য বিশিষ্ট এড-হক কমিটি গঠন করা হয়।
১।চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ(ঢাবি), আহ্বায়ক

২। মনিকা গমেজ(ঢাবি)

৩। বেনেডিক্ট ডায়েস(ঢাবি), সম্পাদক

৪। মাইকেল সরেন(নটর ডেম কলেজ)

৫। টমাস চ্যাং( ডেন্টাল কলেজ)

৬। ক্লেমেন্ট রোজারিও(ঢাবি)

৭। নেভেল ডিঃ রোজারিও(ঢাকা মেডিকেল কলেজ)

৯। লুইস অনিল কস্তা(সলিমুল্লাহ কলেজ)


এড্-হক কমিটি রমনা আর্চ বিশপ হাউজে পরপর কয়েকটি সভা করে প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রনয়ণ করেন। শ্রদ্ধেয় আর্চবিশপ গাঙ্গুলী সংঘ গঠনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং অবিস্মরণীয় সহযোগিতা দান করেন। এড্-হক কমিটিকে সহায়তা করার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যয়নরত ফাদার থিওডোর মজুমদার এবং সমাজ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত ফাদার ষ্টিফেন গমেজকে নিযুক্ত করেন। ১৯ শে এপ্রিল ১৯৭০ সালে এড্-হক কমিটি আহুত সাধারণ সভায় প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র অনুমোদনের মাধ্যমে জন্ম নেয় খ্রীষ্টান ছাত্র কল্যাণ সংঘ, বাংলাদেশ। উপস্থিত সদস্য-সদস্যাদেও প্রত্যক্ষ ভোটে গঠন করা হয় নি¤েœর প্রথম কার্যকরী পরিষদ:

সভাপতি- মি. চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ;

সহসভাপতি-মিস. মনিকা গমেজ;

সাধারণ সম্পাদক- মি. বেনেডিক্ট ডায়েস;

সহসাধারণ সম্পাদক- মি. বনিফাস ডি কস্তা;

কোষাধ্যক্ষ- মি.আলবিন দেশাই;

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক- মি. ডেভিড হেনরী মজুমদার;

সহসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক- মি. সুুবল লুইস কস্তা;

শিক্ষা ও সমাজসেবা সম্পাদক- মি. নেভেল ডিঃ রোজারিও;

সহশিক্ষ ও সমাজসেবা সম্পাদক- মি. পল মিলন কস্তা;

ক্রীড়া সম্পাদক- মি. এডওয়ার্ড কর্নেলিয়াস গমেজ।


আর্চবিশপ টি.এ. গাঙ্গুলীছাত্র কল্যাণ সংঘের প্রথম উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন আর্চবিশপ টি.এ. গাঙ্গুলী, মি. ডেভিড সরকার  ও মি. আলেকজান্ডার রোজারিও। লক্ষ্যণীয় যে, উপদেষ্টা পরিষদটির ধরণও ছিল আন্ত-মা-লিক। সংঘ জন্মেও ২য় বছরে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। জগন্নাথ হলের শতাব্দীর বিভৎসতম হত্যাযজ্ঞের অন্যতম জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী, সংঘের সাধারণ সম্পাদক বেনেডিক্ট ডায়েসের কক্ষে সংরক্ষিত সংঘের জন্মলগ্নের পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বহু নথি ও কাগজপত্র দাহ্য হয়। সংঘের ৩য় বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিকতার বিষবাষ্পে সংঘ আক্রান্ত হয় বিশেষ মহলের প্ররোচনায়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে তৎকালীন সভাপতি ডেভিড হেনরী সজুমদার সভা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভায় পুরো পরিষদসহ পদত্যাগ করেন। এমন এক অচলাবস্থায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীরা সভা মূলতবী ঘোষণা করার প্রস্তাব করেন। তপ্ত আঞ্চলিকতার বিষবাষ্পকে দূর করে নতুনভাবে আবার সভা ডেকে নির্বাচন এবং সংঘের ধারাবাহিকতা বজায় বাখার জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক অস্থায়ী পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। প্রথম থেকেই নিরপেক্ষ থাকাতে সবার সর্বসম্মতিক্রমে নেভেল ডি. রোজারিওকে আহ্বায়ক করে এক অস্থায়ী পরিষদ গঠন করে। পরিষদে কতজন সদস্য ছিল বা কে সচিব ছিল তা আমার মনে নেই, তবে এলবার্ট পি কস্তা ছিল সম্পাদক। পরবর্তীতে ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দের ২ শে এপ্রিল নেভেল ডি. রিাজারিও’র আহ্বানে মুলতবী সভা অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে এলবার্ট পি. কস্টা সভাপতি ও লুইস অনিল কস্তা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।


খ্রীষ্টান ছাত্র কল্যাণ সংঘের প্রথম কার্যকরী পরিষদে শিক্ষা ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হই আমি। একই পরিষদে সহশিক্ষা ও সমাজসেবা সম্পাদক পল মিলন কস্তা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মি. সুবল এল আর এবং ক্রীড়া সম্পাদক ছিল এডুয়ার্ড কর্নেলিয়াস গমেজ। পরিষদের বাইরে ছিল হেনরী রঞ্জন গমেজ, ইসিদোর গমেজ, দীপক কস্তা, হিউবার্ট রঞ্জন কস্তা, সিলভেষ্টার কস্তা, সন্তোষ সরেন, ফ্রান্সিস প্রবোধ রোজারিও, সুনীল কস্তা, ক্লেমেন্ট পিরিচ, যেরম পবিত্র রোজারিও, স্বপন গিলবার্ট গমেজ। বয়সের দিক দিয়ে কাছাকাছি বা সমবয়সী হওয়াতে প্রায় সময়ই আমরা সমসাময়িক অনেক বিষয় বা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতাম, মত বিনিময় করতাম এবং অনেকক্ষেত্রে ঐক্যমতে পৌঁছে কাজে নামতাম। এমনি আলাপ আলোচনার ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ এর একুশে ফেব্রুয়ারি সংঘের পক্ষ থেকে একুশে সংকলন বের করার সিদ্ধান্ত নিই। সংকলনের নাম মি. সুবল এল আর এর প্রস্তাবানুযায়ী ‘অনল’ গৃহীত হয়। সম্পাদনার ভার দেয়া হয় তাকেই। প্রয়োজনীয় অর্থের সংকুলান না হওয়াতে ঐ বছর একশে সংকলন হিসেবে তা সাইক্লোষ্টাইল হিসেবে খুবই সীমিত আকার ও সংখ্যায় বের করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সনে শহীদ দিবস উপলক্ষে‘অনল’ শহীদ স্মরণিকা হিসাবে ছাপানো আকারে প্রকাশিত হয়। ছাপানো শহীদ দিবস স্মরণিকাটি সম্পাদনা করেন সংঘের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মি. সুবল এল আর। ৭৪ সনেই ছাত্র কল্যাণ সংঘ বাংলাদেশে প্রথমবারের মত আয়োজন করে পোপ দিবস। পোপদিবস ও নবীন বরণ উপলক্ষ্যেও অনল সাইক্লোষ্টাইল আকারে বিশেষ স্মরণিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়।


মুখপত্র হিসেবে অনলের যাত্রা শুরু: অনল প্রকাশনা ও ছাত্র কল্যাণ সংঘ
কলেজ পড়ুয়া খ্রীষ্টান ছাত্রদের এক বৃহৎ অংশ থাকতো নটরডেম কলেজের ভিতর অবস্থিত খ্রীষ্টান ছাত্রাবাসে। খ্রীষ্টান ছাত্র কল্যাণ সংঘের কার্যকলাপের একবিরাট অংশ জুড়ে থাকতো এদের অংশগ্রহণ। ১৯৭৩ সনে ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ৩ দিন আগে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ না দেখিয়ে এবং কোন বিল্প ব্যবস্থার চিন্তা না করে একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে নটর ডেম কলেজ খ্রীষ্টান ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হয়। নটরডেম কলেজ খ্রীষ্টান ছাত্রাবাস বন্ধ ও ছাত্রাবাসে অবস্থানরত বিশেষত: ঢাকার বাইরের ছাত্রদেরকে অমানবিকভাবে রাস্তা বের করে দেয়ার প্রতিক্রিয়া দেখা দিল চাপা অসন্তোষ। চাপা বিক্ষোভে ও প্রতিবাদে ফেটে পড়লো ছাত্র কল্যাণ সংঘ। বিরাজমান সমস্যাবলী, সমাজে প্রচলিত অন্যায়-অবিচার আর ছাত্র যুবা মানসের চাপা অসন্তোষ প্রকাশ ও তা দূরীকরণার্থে ছাত্র-যুব-জনতার পারস্পরিক সহানুভুতিশীল সম্পর্কের  উন্নতি করে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ করণীয় নির্ধারণে ছাত্রকল্যাণ সংঘের ’৭৫ এর কার্যকরী পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে একটি মাসিক মুখপত্র হিসেবে অনল হাতে লিখা সাইক্লোষ্টাইল কপি হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। ঐ বছরের পরিষদের সবার মনে বিশ্বাস ছিল যে, অনল তার অনলের অগ্নিদাহে সোনাঝালাইয়ের মতো সমাজের যাবতীয় অন্যায় শোষণ নির্যাতন পুড়ে ছাড়খাড় করে বের করে আনবে সুস্থ ও কল্যাণকর খ্রীষ্টিয় সমাজ, পুষে রাখা সমস্যাদির প্রতিকারে সোচ্চার হয়ে অনল বয়ে আনবে ছোট্ট খ্রীষ্ট সমাজে ন্যায্যতা ও শান্তির বারতা নতুন প্রজন্মের কাছে। ৭৫ এ খ্রীষ্টান ছাত্রকল্যাণ সংঘের দ্বিতীয় বারের মত কার্যকরী পরিষদেও সভাপতি হিসেবে সেদিন অনল মাসিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় সবার চোখে মুখে দেখেছিলাম এ দৃপ্ত অঙ্গীকার। এসময় খ্রীষ্টান ছাত্রকল্যাণ সংঘে গড়ে উঠে সমাজসচেতন ‘থিংক ট্যাঙ্ক’।


অনলের জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিটি সংখ্যায় প্রাধান্য পেতে থাকে খ্রীষ্টান ছাত্রছাত্রীদের প্রাণের দাবী হোস্টেল সমস্যা। একই বছর ১৩ই এপ্রিল ছাত্রকল্যাণ সংঘের সভাপতি নেভেল ডি. রোজারিওকে আহ্বায়ক করে বিভিন্ন সংঘ সমিতির সমন্বয়ে গঠন করা হয় সম্মিলিত হোষ্টেল বাস্তবায়ন কমিটি। তৃতীয় সাইক্লোষ্টাইল করা সংখ্যায় হোস্টেল ইস্যুটাকে সামনে রেখে সুবল এল আর আঁকলো কার্টুন...গাধার পিঠে লম্বা নাকওয়ালা মানুষের নাগালের বাইরে নাকের ডগায় বাঁধা মুলো। ভাবাখানা এমন যে, নাগালবিহীন মুলোরূপী খ্রীষ্টান ছাত্রাবাস এর প্রত্যাশায় গাধারূপী ছাাত্রছাত্রী ধাবমান থাকবে অনাদিকাল পর্যন্ত। হয়তো দারুণ কটাক্ষছিলো সে কার্টুনে কিন্তু সে সময়কার ছাত্রছাত্রীদেও মনের কথাই প্রতিফলিত হয়েছিল সে সংখ্যার সে অনলে। কটাক্ষ ছিলো প্রচন্ড.. . তাই মহলবিশেষের কাছ থেকে যথেষ্ট তিরস্কার ধমক সহ্য করতে হয়েছিল সবাইকে।


হোষ্টেল কমিটি, সর্বদলীয় হোষ্টেল বাস্তবায়ন কমিটি ও সাধারণ খ্রীষ্টভক্তদের দাবী ও ছাত্রদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে৭৫ সনের প্রথম প্রতিভার অন্বেষণ অনুষ্ঠানের শেষদিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পন্ডিত শ্রদ্ধেয় আর্চবিশপ গাঙ্গুলী ঘোষনা দেন, ‘মোহাম্মদপুরে যে ডায়োসিসের সম্পত্তি রয়েছে সেখানে ছেলেদের জন্য হোষ্টেল করে দেয়া হবে। প্রভু আর্চবিশপ তাঁর ভাষণে ছেলেদের জমি দেওয়ার কথা বলেন।(প্রতিবেশী রিপোর্ট, ২৬ শে অক্টোবর, ১৯৭৫)।
অনল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না লিখে শুধু অনল মেনিফেস্ট লিখলেই হয়:
অনল হোক বহ্নিশিখা
অনল বিশ্বাস কওে জনগণের জন্যই শিল্প সাহিত্য।
অনলের প্রাণখোলা আহ্বান.. .
সচেতন সমাজসেবীদের নেতৃত্বে, সমাজের
সকলের ঐক্যে গড়ে উঠুক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধের ঝংকার, প্রতিরোধে
বহ্নিমান চেতনায় শাণিত হোক
সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পীর ক্যানভাস।
জনতার শত্রুর দিকে উদ্যত কিষাণ রমণীর
সুকঠিন হেঁসোর মতই.. .
তীক্ষè ধারালো
বিদ্যুতের মতোই ঝলসানো
অনল.. . আমার প্রাণের অনল।
বাংলাদেশের প্রগতিশীল খ্রীষ্টান ছাত্রছাত্রীদের কন্ঠস্বর হিসেবে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যা সমাজ বিশ্লেষণমূলক, প্রগতিশীল রচনায় সমৃদ্ধহয়ে বাংলাদেশ খ্রীষ্টান প্রকাশনা জগতে ভিন্নমাত্রা আনায়নের দাবীদার অবশ্যই অনল। আজকের প্রগতিশীল খ্রীষ্টান লেখকের অনেকেরই হাতেখড়ি এ অনল পত্রিকায়।

প্রতিভার অন্বেষণ ও ছাত্রকল্যাণ
সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ও সামাজিক অবক্ষয় রোধের প্রাথমিক শর্ত সবাইকে সংস্কৃতিমনা করে তোলা। সে সময়কার  খ্রীষ্টানদের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা তেমন ছিল না। একদিকে ছিল পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব, অন্যদিকে ছিল নিজেদের অনুশীলন-পরিশীলনের আগ্রহের অভাব। এমনি এক অবস্থায় সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টিতে ১৯৭৫ সনে আয়োজন করা হয় ১ম শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহ প্রতিভার অন্বেষণ। সপ্তাহ উল্লেখ করা হলেও সে বছর তা ছিল ৩দিনব্যাপী। প্রথম প্রতিভার অন্বেষণের শেষদিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভাটিক্যানের রাষ্ট্রদূত মহামান্য আর্চবিশপ এডওয়ার্ড ক্যাসিডি। বিশেষ অতিথি ছিলেন আর্চবিশপ টি. এ. গাঙ্গুলী।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা কিন্তু শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সনে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুপ্রেরণায়। গত প্রতিভার অন্বেষণ গুলোতে আগত জ্ঞানী, গুণী ও অতিথিদের কয়েকজনের উদ্ধৃতি সমূহই সম্ভবত: এ অনুষ্ঠানের স্বার্থকতা বা ব্যর্থতার সঠিক মূল্যায়ন।
‘গুণীদেরকে সত্যিকার সম্মান না দিলে আমাদেও সমাজে কল্যানমুখী কিছু গড়ে উঠা সম্ভব নয়। এদিক থেকে ছাত্র কল্যাণ সংঘকে পূর্বসরিই বলতে হয়।’ বিশিষ্ট লেখক নিধন ডি. রোজারিও।(প্রতিবেশী রিপোর্ট: ২০ শে নভেম্বও ১৯৭৭)
‘খ্রীষ্টান ছাত্র কল্যাণ সংঘের প্রতিটি সদস্য যদি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করতে এবং খুঁজে প্রতিভাবান লোকদের কাজে লাগাতো তবে আমাদের সমাজ আরও একধাপ এগিয়ে যেতে সমর্থ হতো। অধ্যাপক করীর চৌধুরী। (প্রতিবেশী রিপোর্ট: ১৮ নভেম্বর ১৯৭৯)।
‘আপনাদের মধ্যে এসে আমি আজ নতুন জীবনের সাড়া দেখতে পাচ্ছি। আপনাদের শ্লোগান প্রতিভার অন্বেষণ সত্যিই বরণীয়। এ শ্লোগানসহ সামনে এগিয়ে যেতে আপনাদের পথে অনেক বাধা আসবে। সে সব বাধাকে আপনাদের বুদ্ধিবলে কাটিয়ে উঠতে হবে। যে দেশের প্রতিভার প্রতি মানুষের ভালবাসা নেই সেদেশ সত্যিকারের মানুষের দেশ নয়। সত্যিকারের মানুষের ভালবাসা হল সেই দেশ, যেখানে মানুষ মানুষকে ভালবাসবে, কেউ ভাল কিছু করলে তাকে উৎসাহিত করবে। যে সমস্ত গুণাবলীর মাধ্যমে এসব মানবীয় বিকাশ প্রতিভার অন্বেষণের মাধ্যমেই সম্ভব।’ শিল্পাচার্য কামরুল হাসান। (সমবার্তা রিপোর্ট , ১৯৮৭)।
এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, হুমায়ুন আহমেদ, ড. জাফর ইকবাল, নির্মলেন্দু গুণ, কামাল লোহানী, আসাদুজ্জামান নূর, সৈয়দ শামসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, আনিসুল হক, বিভিন্ন সাংসদ গুরুত্বপূর্ন বক্তব্য দিয়েছেন।


Print